অস্তমিত – আরশি সেন (স্বাগতা)

অস্তমিত – আরশি সেন (স্বাগতা)

আমাদের অনুভূতিগুলো ভীষন সূক্ষ্ম …. অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে হেরে যায় বারবার । একটা সময়ে যে মানুষগুলো আমাদের জীবনের টপ মোস্ট প্রায়োরিটি লিস্টে ছিলো , আজ বোধহয় আতসকাচ নিয়ে খুঁজলেও তাদের দেখা পাওয়া যাবে না । পড়ার ব্যাচ থেকে শুরু করে স্কুলের গণ্ডি পেরোনো যাদের হাত ধরে , তারাও ভীষণ অদরকারী হয়ে ওঠে একটা সময়ের পর । চিরকালের বদমেজাজি সেই স্যারটার কপালের ভাঁজ বেড়ে যায় বেশ কতগুলো । তাও যখন পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করি , অদ্ভুত এক আনন্দ খেলে যায় তাঁর মুখে । বয়স হয়তো হয়েছে , কিন্তু স্যারের অনুভূতিটা যেন আজও আগের মতোই রয়ে গিয়েছে । ইঁট পাথরের শহরে অনুভূতির ঠিকানা নেই বললেই চলে । এখানে সবাই ব্যবসা করে … কেউ জীবনের জন্য , কেউ বা জীবন নিয়ে । এখন আর নরমাল একটা মেসেজ করে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে থাকতে হয় না যে , কখন ওপার থেকে উত্তর আসবে ! কিংবা নির্জন দুপুরে টেলিফোনের পাশে চুপচাপ বসে ঘন্টার পর ঘন্টা অঞ্জন দত্তের জন্য বেলা বোসকেও অপেক্ষা করতে হয় না আর । তাই অপেক্ষার আড়ালে যে কতোটা আগ্রহটা লুকিয়ে থাকে , সেটা বর্তমান জেনারেশন জানবেই না কখনো । ভীষণ রাগ হলে সবাই ব্লক করে দেয় খুব সহজে , অথচ ব্লক না করেও যে রাগ দেখানো যায় , নিজের খারাপ লাগা টা প্রকাশ করা যায় – এইসব এখনকার দিনে বোঝানোটা বৃথা , কারণ এখন এই রক্ষ শহরের চারদিকে কেবল ego আর attitude এর ছড়াছড়ি । হঠাৎ বৃষ্টি নামলে আজকাল আর ভিজতে বেরোয় না কেউ । ওদের নাকি ঠান্ডা লেগে যাবে ! রোমান্টিক কাপল-রা আবার এমন দিনে নিজের পার্টনারকে নিয়ে oyo রুমে একটা অন্তরঙ্গ মুহূর্তের সুখস্বপ্ন দেখে । এ শহরে মানুষ খুব তাড়াতাড়ি অন্য একটা মানুষের প্রেমে পড়ে যায় । সেই প্রেমে থাকে একে অপরকে একটু ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে । কেউ কেউ আবার প্রেম খুঁজে পেতে চায় সোশ্যাল সাইট থেকে । মানুষ আজও প্রেমে পড়ে …. মোহের প্রেমে পড়ে , আবেগের প্রেমে পড়ে , চাকচিক্যের প্রেমে পড়ে । সমানাধিকারের বড়াই করে , তবে দিনশেষে সমানাধিকার নিয়ে কোনো পোস্ট দেখলে সেখানে ব্যঙ্গাত্মক কথা বলতেও ছাড়ে না । আসলে আমরা এখন বড্ড অশান্ত হয়ে উঠেছি ভিতরে ভিতরে । একসাথে অনেক কিছু পেতে চাই আমরা । যখন সেটা পাই না , অদ্ভুত একটা রাগ আমাদের ভেতর থেকে জড়িয়ে ফেলতে থাকে । প্রথম প্রথম যে মানুষটাকে sorry বলা কোনো ব্যাপার ছিল না , একটা সময় পর সেই মানুষটাকেই ভীষণ অসহ্যকর লাগে আমাদের । মনে হয় , তার কাছে ভুল স্বীকার করলে হয়তো আমাদের আত্মসম্মান কমে যাবে । ঠিক এভাবেই একটু একটু করে দূরত্ব বাড়তে থাকে মানুষ দুটোর মধ্যে । কারণ কেউই নত হতে চায় না । যে সম্পর্কে ইগো-ই প্রধান হয়ে দাঁড়ায় , সে সম্পর্ক তাসের ঘরের মতো ভেঙে যায় । এসব কারণেই একটু একটু করে ডিপ্রেশন বাড়ছে । কলেজ পড়ুয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষজন একাকিত্বের শিকার হয়ে যাচ্ছে । কেউ ঢুকে যাচ্ছে পর্ন সাইটে , কেউ আবার অজান্তেই হাত মেলাচ্ছে অন্ধকার জগতে । আমরা ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলছি খুব তাড়াতাড়ি । যেখানে মাথা ঠান্ডা রাখার দরকার , সেখানে উত্তেজিত হয়ে বলে ফেলছি ভুলভাল কিছু কথা । ‘মনের অসুখ’কে পাগলামি বলে ভুল ভেবে থাকেন অনেকেই । তাই হয়তো সাইক্রিয়াটিস্টের পরামর্শ নিতে ভরসা পায় না অনেকেই । পুরনো রাগ কিংবা আক্রোশ থেকে জন্ম নেয় প্রতিহিংসা । সেটাই জমতে জমতে একটা সময় পর ভীষণ ভয়ানক একটা রূপ ধারণ করে । আমরা নিজেদের চাওয়ার পরিমানটা এতোটাই বাড়িয়ে দিই যে , অপর দিকের মানুষটার উপর তার প্রভাব কিরকম পড়বে , সে বিষয়ে ভাবিই না একদম । আমরা আসলে এতোটাই সোশ্যাল মিডিয়ায় বদ্ধ হয়ে গিয়েছি যে , আমরা বুঝতে চাইনা কিছু । মনে করি , আমরা যেটা ভাবছি , সেটাই হয়তো ঠিক । আমার বিরুদ্ধে গেলেই সেই মানুষটা নিশ্চয়ই আমার খারাপ চাইছে ! আমার হটকারী সিদ্ধান্তগুলো কেউ সাপোর্ট না করলে সে আমার শুভাকাঙ্ক্ষী নয় । যদিও এই সমস্ত ভাবনাই আমাদের কাল্পনিক । জীবনটা ঋত্বিক রোশনের ‘koi mil Gaya’ নয় । এখানে শুরুটাও আমাকেই করতে হয় আর শেষটাও । তবে বাবা-মায়েরাও এতোটা ব্যস্ত হয়ে যায় যে , বাচ্চাদের কে ভালো ভাবে বোঝানোর সময় থাকে না তাদের যে কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল ! ইঁট পাথরের শহরে থাকতে থাকতে আমরা নিজেরাও ভেতর থেকে কেমন যেন কাঠখোট্টা হয়ে গিয়েছি । খুব সহজে মায়া হয় না আমাদের আর । মর্ডান হতে হতে কোথাও গিয়ে আমরা যেন আমাদের পুরনো সত্তাটাকে হারিয়ে ফেলেছি । বন্ধুদের সামনে কম দামি খাবার কিনে খেতে লজ্জা পাই আমরা । পছন্দের বাইকটা পাইনি বলে রাগের মাথায় বাবাকে দু-চার কথা শুনিয়েও দিই । যে মানুষগুলো আমাদের অল্প আদরে জড়িয়ে রাখে , তাদেরকেও ‘taken for granted’ ভেবে বসি । আকাশ মেঘলা হলে আমাদের মনে কোনো অনুভূতি জাগে না , বরং বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে কয়েকটা ছবি তুলে #photography লিখে ছেড়ে দিই সোশ্যাল মিডিয়ায় । ‘গরিব – বড়লোক ভেদাভেদ করবেন না’ ফেসবুকে ক্যাপশন দিয়ে এসেই হঠাৎ পকেটে ৫০০ টাকার নোটটা না পেয়ে সন্দেহের চোখে চেয়ে দেখি ছেঁড়া সুতির শার্ট পরা বুড়ো লোকটাকে । সিগারেট পছন্দ না করা ছেলেটাও একটা সময় পর chainsmoker হয়ে ওঠে । ইনজেকশন নিতে ভয় পাওয়া মেয়েটাও হাতের শিরা কেটে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটায় । নিজেদের অজান্তেই যান্ত্রিক হয়ে উঠছি আমরা । আমাদের অজান্তেই কেউ কলকাঠি নাড়ছে আর আমরা সেগুলো মেনে নিচ্ছি মুখ বন্ধ করে ।আমরা ভাবছি না , বুঝছি না , বুঝতে চাইছি না । শুধু একটা trend ফলো করে চলেছি … আমরা ততোটাই দেখি , যতোটা ট্রেন্ডে থাকে । আমরা সেটাই মানি , যেটা রণবীর কাপুর কিংবা দীপিকা পাড়ুকোন অ্যাড দেয় । আমরা অন্ধের মত বিশ্বাস করি তাদের , যারা আদপেই অন্যের চালিত পুতুল । নিজস্বীর ভিড়ে নিজস্বতাকে হারিয়ে ফেলছি আমরা । আমরা মনে করি আমাদের সব অন্যায় -অপরাধ -অভিযোগগুলো মেনে নিয়েও দিনশেষে থেকে যাবে কেউ । আমরা সব সময় একটা perfect মানুষ খুঁজি এমন একটা মানুষ – যে কোনোদিন কোনো ভুল করবে না , যে আমায় বুঝবে মুখ ফুটে কিছু না বললেও , আমি রাগ করবো , সে রাগ ভাঙ্গাবে ; আমি ভুল করবো , সে আমায় শুধরে দেবে … ওই যে বললাম , আমরা ফিল্মের সঙ্গে বাস্তবটাকে মিশিয়ে ফেলছি ভুল করে । আর এর ফলে আমরা একটু একটু করে ‘একা’ হয়ে যাচ্ছি । আমাদেরকে বোঝার মানুষগুলো হারিয়ে যাচ্ছে এক এক করে । কিন্তু আমরা নত হতে পারছি না , বলতে পারছি না যে , “তুমি থেকে গেলে পারতে” ! এভাবে আমাদের পছন্দের তালিকা থেকে একটা করে নাম মুছে যেতে থাকে আর আমরা “যে থাকার না সে থাকবে না , তাই এও রইলো না …. আমার মানুষটা নিশ্চয়ই ঠিক সময়ে শুধু আমার হবে” এমন একটা সান্ত্বনা দিয়ে নিজেই নিজের মাথায় হাত বুলিয়ে দিই ক্লান্তিতে । ঘুমের প্রলেপ লেপে যায় আমাদের ডার্ক সার্কেল পড়া চোখের পাতায়। নিজের প্রিয় মানুষ গুলোকে কখনো একলা ছেড়ো না , কারণ আজ তুমি তাদের একলা ছেড়ে দিলে যেদিন তুমি নিজে একলা হয়ে যাবে , সেদিন জড়িয়ে ধরে সান্তনা দেওয়ার মতোও কাউকে পাবে না …. তাই জীবনে ‘আজ’ যেটা আছে তোমার কাছে , সেটা নিয়ে ভালো থাকো … থাকতে শেখো ……

This Post Has 4 Comments

  1. দেবকুমার মুখোপাধ্যায়

    কয়েকটি লেখা পড়লাম। ভালো লাগল।

  2. Sudhan Rajbanshi

    খুব ভালো হয়েছে তোমার লেখাটা 😇 অনেকটা ভালোবাসা স্বাগতা 🤗❤️

  3. Suprotim

    ❤️❤️❤️এগিয়ে যাও পাশে আছি

  4. Misti Banerjee

    Really awesome story.khub sundor

Leave a Reply