চলচ্চিত্র সমালোচনা : ‘ড্রাকুলা স্যার’ – অভিষেক ঘোষ

চলচ্চিত্র সমালোচনা : ‘ড্রাকুলা স্যার’ – অভিষেক ঘোষ

 

সিনেমা : ‘ড্রাকুলা স্যার’ (২০২০)
পরিচালক : দেবালয় ভট্টাচার্য ।
অভিনয়ে : অনির্বাণ ভট্টাচার্য, মিমি চক্রবর্তী, বিদীপ্তা চক্রবর্তী, রুদ্রনীল ঘোষ, সুপ্রিয় দত্ত ।

আর পাঁচটা হাইলি সাস্পিশিয়াস এবং অ্যাম্বিসাস বাংলা ছবির মতোই সেই নকশাল-আদিখ্যেতার চাদর চাপিয়ে, নবারুণ ভট্টাচার্য আউড়ে, কথায় কথায় কাব্যি করে, সময় নিয়ে ‘টেনেট-টেনেট’ খেলে, এপিসোডের ভিতরে পাস্ট-প্রেজেন্ট ঢুকিয়ে তুঘলকি চাল দেখিয়ে, একপিস্ তাজ্জব হযবরল-র মধ্যে জোনাকি-কে আকাশের তারা ও রুদ্রনীলকে বিদ্যাসাগর ভাবা, আরেকটি আক্ষুটে বাংলা ছবি এই ‘ড্রাকুলা স্যার’ ! সারল্য যার রক্তে নেই, সিনেমা তো দূরের কথা !

দুই পৃথক সময়-পর্বে এই ছবির গল্প বিন্যস্ত । সত্তরের দশকে যেখানে অমল মঞ্জরীর সমাজ বহির্ভূত, অবৈধ প্রেম দেখানো হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে এই সময়ে, হুগলির একটি স্কুলে অস্থায়ী শিক্ষকরূপে কর্মরত রক্তিম (রক্তিম ও অমল দুটি চরিত্রেই অনির্বাণ ভট্টাচার্য)-কে দেখানো হচ্ছে, যার মনে হয় সে, সত্তরের দশকে অমল নামেই পরিচিত ছিল । সে সময়ের কবর খুঁড়ে ফের ফিরে এসেছে এই সময়ে, ফিরে এসেছে ড্রাকুলা হয়ে, রক্তপায়ী রূপে । ছবি যত এগোতে থাকে, ততই আমরা বুঝতে পারি, কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা সেটা গুলিয়ে দেওয়াই পরিচালকের মূল উদ্দেশ্য । এই চালাকির দ্বারা কোনো মহৎ উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় না, বড়ো জোর একখানা ‘সাধের লাউ’ বানানো যায় । সেই সঙ্গে দর্শক এবং পরিচালক উভয়কেই বুঝতে হবে, দেবালয় কিছুতেই ক্রিস্টোফার নোলান নন । তাই তিনি যত গুলিয়ে দেবার চেষ্টা করেছেন, তিনি নিজেই ততো গুলিয়ে ফেলেছেন । ছবির শেষের দিকে যে প্রমাণ হয়ে গেল, “আসলে সত্যি বলে সত্যিই কিছু নেই”, সেই সঙ্গেই গোটা ছবির কাঠামোটাই তৎক্ষণাৎ ধ্বসে পড়ে । বড্ড জোর করেই যেন সবকিছু মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো শেষের দিকে, প্রচন্ড রকম তাড়াহুড়ো করে ।

এই ছবিতে সত্তরের দশকের একজন বাঙালি বিধবা হিন্দু মেয়ে ম্যাচিং কালো রঙের শাড়ি ব্লাউজ, গয়নাগাটি পরে বিছানায় শুয়ে থাকে আর একা বাড়িতে লুকিয়ে রাখে প্রাক্তন প্রেমিককে ! এর থেকে বড় গাজন বাংলা সিনেমা ছাড়া আর কে দেখাবে ! মানে এমন কল্পনাই বা কোনো শিক্ষিত বাঙালি যুবক (সে মানসিক রোগী বা, পাগল হলেও) করতে যাবে কেন ? ভাবতে খারাপ লাগে, মাত্র কয়েকবছর আগেও এই বাংলায় বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় ‘শিল্পান্তর’-এর মতো স্ট্রাইকিং আর অনবদ্য ছবি বানিয়েছেন, যে ছবির সঙ্গে বাংলার মাটির ও লোক-সংস্কৃতির যোগাযোগ ছিল ! আর আজ ! এইসব সস্তা, শূন্যগর্ভ, আঁতলামি-ভ’রা, গিমিক-পরিপূর্ণ, উদ্ভট রোম্যান্স বানানো চলছে । যখন পৃথিবীজুড়ে তুমুল অস্থিরতা, তখনও এদের শৌখিন রোম্যান্টিজম্ গেলো না । সত্তরের দশক আজ বাংলা সিনেমায় বিলাসিতার উপকরণ, পাটোয়ারী বুদ্ধি কবিতা আর ইতিহাস নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে ! আর দর্শকও তেমনি ! এই ছবিকে ‘জোকার’-এর সাথে তুলনা করে কেউ ? এই ছবির তো গোত্রের (জঁর)-ও ঠিক নেই ।

যত বিপ্লব শুধু মুখে আর ঘরের মধ্যে… ভাব-খানা এমন যেন দুটো মিছিল দেখালে আর চারটি কাব্যি করলেই সত্তরের দশক দেখানো হয়ে যায় ! এই জন্যই এরা সিরিয়াস সিনেমা কোনোদিনই বানাতে পারেনা ! যত গাঁজাখুরি গল্প… ‘মেঘনাদবধ রহস্য’ বলে আরেকটি সিনেমা দেখেছিলাম, ওটাতেও ‘নকশাল-নকশাল’ কেত্ ছিল (পড়ুন দায়বদ্ধতার অভাব)… এই সিনেমাগুলো সিরিয়ালের-ও অধম । বিপ্লব নিয়ে অত যদি ভালোবাসা থাকে, তাহলে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ – না ক’রে বানাক্ না দেখি, সত্তরের দশক নিয়ে একটা সত্যিকার ছবি । নকশাল-নকশাল খেলতে খেলতে দুম করে সাইকোলজির দেওয়ালে গ্রাফিতি বানাতে লাগলো, বেআক্কেলে ছবিটা !

সত্যি বলতে কিছুই ভালো লাগে নি ছবিটায় । কেউ কেউ বলেছেন, গান ভালো ! আমি তো শুনলাম, একই মিউজিক আর একই কথা সারাক্ষণ বাজলো… এ কি রে ভাই ! এদের তো ক্রিয়েটিভিটি বলেই কিছু নাই ! এমন একটা শট্ নেই যেটা নিজেই নিজেতে সম্পূর্ণ । ওদিকে ক্লোজ আপে ক্যামেরা দুলছে ! আর তারপর সিনেমার মধ্যে শুটিং-এর সীনে জোকার খেলো থাপ্পর । কলকাতায় নাকি বরফও পড়েছিল ? কমার্শিয়াল সিনেমার একজন নায়িকা (ছবির একটি দৃশ্যে), দুম করে একজন জুনিয়ার (তাও আমন্ত্রিত) আর্টিস্টকে, ইন্টিমেট সীনে, সোজা থাপ্পড় মারতে পারে ?

মেজরিটির এটাকেই পোয়েটিক লাগলে, জোকারের সমান মনে হলে, অনির্বানকে জাতীয় পুরস্কার দেওয়া উচিত মনে হলে আর পরিচালক বেশি এফোর্ট কেনই বা দেবেন ? রক্তিম যদি ড্রাকুলা না-ও হত, কলকাতায় যদি বরফ নাও পড়ত, নকশাল আন্দোলন যদি ইতিহাসের পাতায় (অথবা ছবিতে) না-ও থাকত, তাও ছবির ‘মূূল গল্পটা’ বলা যেত । তাও যে এগুলোর প্রত্যেকটা দেখাতে হল ও দেখাতে গিয়ে খিচুড়ি বানাতে হল, এটাই প্রমাণ করে, এরা বেচুবাবুর দল । প্রোডাক্ট বেচার জন্য গিমিকে খেলছে… আপনি তাইওয়ানের ছবি ‘ডিটেনশন’ (২০১৯) দেখুুন… সময় নিয়ে কেমন চমৎকার কুহকী ট্রিটমেন্ট ও মনস্তত্ত্বের জটিল গোলকধাঁধা উক্ত ছবিতেও আছে । দেখলে বুঝবেন, কীভাবে এই ধরণের গল্প বলতে হয় ! মিমি-কে দেখেই কেবল আমার মায়া হচ্ছিল ! ওঁর পার্টটা কী ? বাংলার জোকারের (স্বঘোষিত) মাথার অবান্তর টিউমার ?

পুনশ্চ : রক্তপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর-ই বটে… ।

Leave a Reply