“স্মৃতির সরণিতে সংগ্রামী মঞ্জু” – পুস্তক পর্যালোচনা – গোবিন্দ মোদক

“স্মৃতির সরণিতে সংগ্রামী মঞ্জু” – পুস্তক পর্যালোচনা – গোবিন্দ মোদক

পুস্তক পর্যালোচনা / বই আলোচনা


পুস্তক: স্মৃতির সরণিতে সংগ্রামী মঞ্জু।
সম্পাদক: সুদেষ্ণা চক্রবর্তী ।
প্রকাশক: শরৎশশী। হাওড়া।
পর্যালোচক: গোবিন্দ মোদক।

করোনা আবহে বিশেষভাবে অবকাশ পাবার দরুণ কবি-লেখক-শিল্পীরা তাঁদের সৃজনশীলতাকে আরও বিকশিত করবার সুযোগ পেয়েছেন — প্রকাশিত হয়েছে অজস্র কবিতার বই, ছড়াগ্রন্থ, অণুগল্প সংকলন, গল্পগ্রন্থ ইত্যাদি ; তবে ভিন্নধর্মী গদ্যগ্রন্থ তথা অনুপ্রেরণামূলক গ্রন্থের সংখ্যা যথেষ্টই নগণ্য — তবু তারই মধ্যে সুলেখিকা সুদেষ্ণা চক্রবর্তী সম্পাদিত 172 পৃষ্ঠার “স্মৃতির সরণিতে সংগ্রামী মঞ্জু” গ্রন্থটি তার উজ্জ্বল ব্যতিক্রম যেখানে প্রকৃত অর্থেই ছিন্নমূল একজন সাধারণ নারীর জীবন সংগ্রাম ও মহিয়সীতে উত্তরণের ঘটনাগুলিকে উপজীব্য করে রচিত হয়েছে এক ভিন্নধর্মী জীবনালেখ্য তথা সংগ্রামের কাহিনী, যা আরও আরও বঞ্চিত, অবহেলিত মানুষকে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, স্বাবলম্বী হয়ে উঠবার অনুপ্রেরণা যোগাবে। আসুন, “তমসো মা জ্যোতির্গময়” — এই উপনিষদবাণীকে স্মরণ করে গ্রন্থটির অন্দরমহলে একটু উঁকিঝুঁকি দিতে চেষ্টা করি।

যদিও শ্রীমতি মঞ্জু দাস (১৯৫২-২০১৯) তেমন স্বনামধন্যা কোনও মহিয়সী রমণী নন যাঁকে নিয়ে খবরের কাগজে কলম লেখা হয়েছে বা দূরদর্শনে তা সম্প্রচারিত হয়েছে — তথাপি তিনি সেই সংগ্রামী ব্যক্তিত্বদের একজন যিনি স্বজনহারা হয়ে মাত্র তিন বছর বয়সে উদ্বাস্তু হয়ে এপার বাংলায় এসে বিভিন্ন অনাথ আশ্রমের নিপীড়িত, কুয়াশাচ্ছন্ন জীবনের অনিশ্চয়তাকে জয় করে ‘সত্যম্ শিবম্ সুন্দরম্’ এর পথ ধরে আজীবন জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছেন — অসংখ্য শিশু-কিশোর মনে জ্ঞানের দীপশিখা প্রজ্জ্বলিত করে গেছেন। সমস্ত প্রতিকূলতাকে অসীম মানসিক শক্তিতে অতিক্রম করে নিজের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে অবিচল ভাবে এগিয়ে গেছেন। হয়তো আক্ষরিক অর্থে তিনি খ্যাতির সেই শীর্ষে পৌঁছুতে পারেননি, কিন্তু অখ্যাতির শেষ ধাপ থেকে উঠে এসেছেন নিরন্তর সংগ্রামের পথ অবলম্বন করে — এবং এভাবে তাঁর সেবা, সততা আর সু-কর্ম দিয়ে খুব সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অনেক বিদগ্ধ মানুষজনের স্মরণে-মননে স্থান করে নিয়েছেন।

কিন্তু তার এই যাত্রাপথ সর্বদা মসৃণ বা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না — এক মুঠো ভাত পাবার আশায় অনাথ আশ্রমে তাঁকে যেমন রান্নার ঠাকুর ও জোগাড়ে মাসিদের গাদা গাদা জামা-কাপড় কেচে দিতে হয়েছে, তেমনই পরবর্তীতে অর্থাভাবে বিভিন্ন বাড়ির বাচ্চাদের পড়িয়ে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে নিজেকে স্নাতক স্তরে উন্নীত করেছেন, বেসিক শিক্ষকতার ট্রেনিং কোর্সে ডিপ্লোমা করেছেন। এভাবে লক্ষ্য স্থির রেখে অদম্য মনোবল পাথেয় করে পৌঁছাতে পেরেছেন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে — নিজেকে নিয়োজিত করতে সক্ষম হয়েছেন শিক্ষকতায়, মানুষের সেবায়, সাহিত্যচর্চায় ও পত্রিকা সম্পাদনায়।

শ্রীরামকৃষ্ণ, সারদা মা ও বিবেকানন্দের ভাবাদর্শে দীক্ষিত মঞ্জুদেবী ছিলেন মানুষের সেবাধর্মে নিবেদিতপ্রাণা। তাই তো তাঁর এই সু-কৃতি মানুষের মনের পাতায় এতোটাই ছাপ রেখেছে যে শতাধিক বিদগ্ধ ব্যক্তি (অধ্যাপক, গবেষক, সাহিত্যিক, কবি, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, সহকর্মী, প্রতিবেশী এবং সাধারন মানুষ) তাঁর এই কর্মময় জীবনকে কুর্নিশ জানিয়ে শ্রদ্ধায়-ভালবাসায় স্মরণ করেছেন …. যার সারাংশ বিধৃত হয়েছে “স্মৃতির সরণিতে সংগ্রামী মঞ্জু” শীর্ষক সংকলন গ্রন্থটির মর্মর পাতায় পাতায়। আশা করা যেতেই পারে যে তাঁর জীবন সংগ্রাম এবং উত্তরণের এই অধ্যায় অনেক হেরে যাওয়া অবহেলিত-বঞ্চিত মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে। আর ঠিক সেইখানেই গ্রন্থটির সার্থকতা।

গ্রন্থটির উপরি পাওনা হলো মঞ্জুদেবীর বেশ কিছু আলোকচিত্রসহ তাঁর সাহিত্যচর্চার বেশ কিছু উৎকৃষ্ট নিদর্শন যা গ্রন্থটিতে মান্যতার সঙ্গে সংযোজিত হয়েছে । ঝকঝকে নির্ভুল ছাপা, উৎকৃষ্ট কাগজ, মজবুত বাঁধাই এবং মালটিকালার ল্যামিনেটেড প্রচ্ছদ বইটিকে প্রকৃত অর্থেই দৃষ্টিনন্দন করেছে এবং বইটির গ্রহণযোগ্যতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বইটির প্রকাশক হলেন শরৎশশী, অবিনাশ ব্যানার্জি লেন, হাওড়া- ৭১১১০৪ ( মুঠোফোন: ৯৪৩২১০৯৯১৭) এবং প্রাপ্তিস্থান পাতাবাহার, কলেজ স্কোয়ার ইস্ট, কলকাতা-৭৩, স্টল নম্বর দশ-এগারো। এছাড়াও ধ্যানবিন্দু (স্টল নম্বর পাঁচ-ছয়) এবং অন্যান্য পরিবেশকের কাছে বইটি পাওয়া যাচ্ছে। বইটির মূল্য মাত্র দেড়শো টাকা। বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।

Leave a Reply